সিবিএন ডেস্ক:
কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের টাউনশিপ এলাকায় নির্মাণাধীন একটি ভবনের নিচ থেকে মনির নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পরিবারের দাবি, দুই দিন নিখোঁজ থাকার পর সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তাঁর মরদেহের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।
স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে, মনিরকে চুরির সন্দেহে আটক করা হয়েছিল। এরপর তাঁর ওপর মারধর বা নির্যাতন চালানো হয়েছিল কি না এবং কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা ময়নাতদন্ত ও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাউকে চোর সন্দেহে আটক করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। চুরি হয়ে থাকলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করার কথা। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই কাউকে মারধর করা হলে সেটি গুরুতর অপরাধে পরিণত হতে পারে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মনির প্রকল্পের টাউনশিপ এলাকায় কীভাবে প্রবেশ করেছিলেন, সেখানে তাঁকে কে বা কারা আটক করেছিলেন এবং আটকের পর তাঁর সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রকল্প এলাকায় থাকা নিরাপত্তা ক্যামেরার (সিসিটিভি) ফুটেজ, প্রবেশ ও বের হওয়ার রেকর্ড, নিরাপত্তাকর্মীদের ডিউটি তালিকা এবং ঘটনাস্থলে থাকা শ্রমিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।
মনিরের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ করা হলে, তদন্তকারী সংস্থার উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর শরীরে আঘাতের চিহ্ন, মৃত্যুর ধরন ও সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
মাতারবাড়ীর স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করছেন, এর আগেও ইউনুছখালী এলাকায় চোর সন্দেহে দুই ব্যক্তিকে মারধর করে হত্যার পর মরদেহ কহেলিয়া নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, অতীতে এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে সেগুলোর যথাযথ তদন্ত ও বিচার হয়েছে কি না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হলে চোর সন্দেহে কাউকে আটক করে নিজেরাই শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
কোনো ব্যক্তি সত্যিই চুরি করেছেন কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের। চুরির অভিযোগ থাকলে প্রচলিত আইনে মামলা হতে পারে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, মনিরের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ থাকলে তাঁকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা যেত। তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু চোর সন্দেহে কাউকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ সত্য হলে সেটি কোনোভাবেই আইনসম্মত পন্থা হতে পারে না।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের দাবি, মনিরের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি ঘটনার সময় টাউনশিপ এলাকায় দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, শ্রমিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। প্রকল্পের সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রবেশ-বহির্গমন সংক্রান্ত নথিও সংরক্ষণ করে তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মাতারবাড়ীবাসীর প্রশ্ন একটাই—মনির যদি চুরি করে থাকেন, তাহলে তাঁকে আইনের হাতে তুলে না দিয়ে তাঁর কী হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর এখন নির্ভর করছে তদন্ত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ওপর। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন স্থানীয়দের প্রধান দাবি।
